আপডেট : ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১০:২৫

গাজীপুরে বিএনপির ‘পথের কাঁটা’ হেফাজত

অনলাইন ডেস্ক
গাজীপুরে বিএনপির ‘পথের কাঁটা’ হেফাজত

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াত নেতা এস এম সানাউল্লাহ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলেও সাবেক জোটসঙ্গী ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ফজলুর রহমান মেয়র পদে লড়াই করছেন। তিনি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক আলোচিত আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলামীর গাজীপুরের জেলা আমির।

২০১৩ সালে বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানের হয়ে ভোট চেয়েছিলেন ফজলুর রহমান। এবার মেয়র পদে তিনি ধানের শীষের একজন প্রতিদ্বন্দ্বী।

ফজলুর রহমান ভোটের লড়াইয়ে হেফাজত পরিচয়টি সামনে না আনলেও তার পক্ষে যারা প্রচার যুদ্ধে নামবেন তাদের একটি বড় অংশই হেফাজতের কর্মী ও সমর্থক। ১৯৯৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি, গোলাম আযমের জামায়াতে ইসলামী এবং আজিজুল হকের ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে বিএনপি জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে ২০১৬ সাল অবধি বর্তমান হেফাজতপন্থীদের ভোট গেছে বিএনপির বাক্সেই। কিন্তু ওই বছরের ৭ জানুয়ারি বিএনপির জোট ছাড়ে ইসলামী ঐক্যজোট। তাই এবারই প্রথম তা পড়বে আলাদা বাক্সে।

২০১০ সালে নারীনীতিবিরোধী আন্দোলন করতে গঠন করা হেফাজতে ইসলামী ব্যাপক পরিচিতি পায় ২০১৩ সালে। ওই বছর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে এই আন্দোলনকারীদের ‘নাস্তিক’ দাবি করে হেফাজত পাল্টা আন্দোলনে নামে ১৩ দফা দাবিতে। আর ওই বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে তারা অবস্থান নিয়ে এক পর্যায়ে সরকার পতনের দাবি জানায় তারা।

ওই রাতে হেফাজত কর্মীদের হটাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে সে সময় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর গুজব ছড়ায় আর সেটি সরকারের জন্য তীব্র চাপ তৈরি করে। আর কয়েক মাসের ব্যবধানে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বড় ব্যবধানে হেরে যান আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

ওই নির্বাচনে হেফাজত অনুসারীদের শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে ‘বিকৃত তথ্য’ ও আবেগী বক্তব্য তখন ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে বলে ধারণা করা হয়।

হেফাজত নেতারা ওই নির্বাচনের আগে ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারেই মাঠে নেমে বিএনপির পক্ষে জনসমর্থন নেয়ার চেষ্টা করেন। আর এর সুফলও পায় দেশের বৃহত্তম দুই দলের একটি।

তখন আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসেবে পরিচিত গাজীপুরে ক্ষমতাসীন দলের ডাকসাইটে নেতা আজমত উল্লাহ খানকে দেড় লাখ ভোটে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপির এম এ মান্নান।

আগামী ১৫ মের ভোটকে সামনে রেখে গাজীপুরে প্রার্থী পাল্টেছে বড় দুই দলই। আওয়ামী লীগ এবার মনোনয়ন দিয়েছে গতবারের ‘বিদ্রোহী’ জাহাঙ্গীর আলমকে। আর বিএনপি তার দলীয় প্রতীক দিয়েছে সাবেক জাতীয় পার্টির নেতা হাসানউদ্দিন সরকারকে।

আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ভোটযুদ্ধে নজর থাকবে সারা দেশের। ১১ লাখেরও বেশি ভোটার অধ্যুষিত এলাকায় গতবার বিএনপির প্রার্থীর বিপুল জয়ে এটিকে আর আওয়ামী লীগের দূর্গ বলার সুযোগ নেই। ফলে এখানে জয় মানেই দেশবাসীর কাছে একটি বার্তা পৌঁছে যাবে, জানা যাবে জনগণের কাছে কোন দলের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

আর জনপ্রিয়তার এই পরীক্ষায় পাস করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন মরিয়া। বিএনপির শরিক জামায়াতের প্রার্থী এস এম সানাউল্লাহ এবং আওয়ামী লীগের শরিক জাসদের প্রার্থী রাশেদুল হাসান রানাকে ভোটের ময়দান থেকে তুলে দিতে দুই দলই চেষ্টা করেছে আপ্রাণ। এই নির্বাচনী এলাকায় জাসদ বা জামায়াত, কারও বলার মতো ভোট নেই। তারপরও ঝুঁকি নিতে চায়নি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি।

এর মধ্যে বিএনপিকে নিশ্চিতভাবেই হলেও বেকায়দায় ফেলবেন ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী তথা গাজীপুর হেফাজতের আমির ফজলুর রহমান। দেশের অন্যান্য এলাকার মতো এখানেও বিপুল সংখ্যক কওমি মাদ্রাসা রয়েছে এবং তাদের ছাত্র-শিক্ষক এবং অনুসারীদের উল্লৈখযোগ্য সংখ্যক ভোট আছে। আমার মসজিদ মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্তদের একটি বড় অংশই নিশ্চিতভাবে ফজলুর রহমানের পক্ষেই কাজ করবেন, তাকে ভোট দেবেন। যে ভোট ২০১৩ সালে পেয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নান।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমরা ২০ দলীয় জোট থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছি। স্বতন্ত্রভাবে আমরা নিজেদের মতো করে আন্দোলন সংগ্রাম করছি। ইসলামী ঐক্যজোট এবার নিবন্ধিত দল হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হেফাজত নেতার আলাদা ভোট করা আমাদের জন্য সুখকর নয়। ২০১৩ সালে তারা আমাদেরকে অনেক ভোট এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার আর তা হচ্ছে না, বরং ভোট ভাগ হয়ে যাবে। তবে এতে আমরা চিন্তিত নই। আমরা মনে করি তারপরও ধানের শীষের প্রার্থী এখানে জিতবে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ বলেন, ‘হেফাজতকে নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেভাবে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাতে আমি মনে করি এই ছাত্র-শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা এবার আমাদেরকেই নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন।’

আজ মঙ্গলবার প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ভোটের প্রচার। আওয়ামী লীগের জাহাঙ্গীর আলম নৌকা, বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার ধানের শীষ, ইসলামী ঐক্যজোটের ফজলুর রহমান মিনার প্রতীক পাবেন।

এই নির্বাচনে আরও চার জন প্রার্থী আছেন। এরা হলেন: সিপিবি রুহুল আমিন, ইসলামী আন্দোলনের নাসির উদ্দিন, ইসলামী ঐক্য ফ্রন্টের জালাল উদ্দিন এবং স্বতন্ত্র ফরিদ উদ্দিন।

৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১৯টি সংরক্ষিত নারী আসনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন।

গাজীপুরে যেদিন ভোট হবে, সেদিন ভোট হবে দক্ষিণের সবচেয়ে বড় জেলা খুলনা মহানগরেও। সেখানে আওয়ামী লীগের নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন তালুকদার আবদুল খালেক আর বিএনপির ধানের শীষ পেয়েছেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু।

উপরে