আপডেট : ২১ জুলাই, ২০১৮ ১৪:৪১

ক্রিকেটের মাঠ থেকে প্রধানমন্ত্রী?

অনলাইন ডেস্ক
ক্রিকেটের মাঠ থেকে প্রধানমন্ত্রী?

গোটা বিশ্ব তাঁকে চিনতো একজন প্লেবয় হিসেবে, যিনি ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে লাহোরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ইমরান খান অক্সফোর্ডে দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যেই পাকিস্তানের হয়ে প্রথম ক্রিকেট খেলেছিলেন তিনি।

ব্যাট ও বল হাতে সমান পারদর্শী ইমরানকেই ক্রিকেটে পাকিস্তানের পরাশক্তি হয়ে ওঠার অন্যতম কারিগর বলা হয়। ক্রিকেট থেকে অবসরে যাওয়ার পর দেশের বির্পযস্ত অবস্থায় সেই ইমরানই রাজনীতির মাঠে আবির্ভূত হন। তবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মূল বাধা ছিল নিজের ব্যক্তিগত জীবন। বিয়ে করেছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য জেমিমা গোল্ডস্মিথকে। ধর্মান্তরিত হওয়া জেমিমার সঙ্গে তাঁর ৯ বছরের সংসারের ইতি ঘটে ২০০৪ সালে। ২০১৫ সালে তিনি বিয়ে করেন পাকিস্তানি সাংবাদিক রেহাম খানকে, যে বিয়ের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক মাস। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একসময়কার এই হার্টথ্রব ক্রিকেটার বিয়ে করেন তাঁর আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু বুশরা মানেকাকে।

ইমরান খানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের চেয়েও দীর্ঘ। জীবনের একটা সময়ে নাইটক্লাবে সুপারমডেলদের নিয়ে মত্ত থাকা ইমরান রাজনীতিতে এসে অনেক পরিণত হয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানে রাজনীতি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখানে রাজনীতি নিরাপদ নয়। যদিও ইংল্যান্ডে এটা এক টুকরো কেকের মতো, আর যুক্তরাষ্ট্রেও অনেক সহজ একটি বিষয়। তবে এখানে আপনাকে মাফিয়াদের সঙ্গে লড়তে হবে, আর প্রাণ হারানোর আশঙ্কা তো আছেই।’

২৫ জুলাইয়ের সাধারন নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসবে নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রী হতে হলে পাকিস্তানের দুই রাজনৈতিক পরাশক্তিকে হারিয়েই ইমরানের পিটিআই পার্টিকে ক্ষমতায় আসতে হবে। ২০ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তানকে তিনি দুর্নীতিমুক্ত করে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হবার দারপ্রান্ত থেকে তুলে আনবেন বলে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

অনেকেই তাকে তালেবানের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর না হবার জন্য সমালোচনা করে থাকেন। ২০১৪ সালে পেশোয়ারের এক স্কুলে ১৪৯ জনকে হত্যা করা হয়, যার মধ্যে ১৩২ জনই ছিলো শিশু, এমনকি তালেবানরা নিজেরাই এর দায় স্বীকার করেছিলো। ২০১৬ সালে ইমরানকে ওসামা বিন লাদেন সন্ত্রাসী ছিলেন কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অনেকেই তাঁকে তালেবান খান বলে অভিহিত করে থাকেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের উদয় হয় রাজনীতি থেকেই, ধর্ম থেকে নয়।’

গত বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দুর্নীতি প্রকাশ পাবার পর পাকিস্তানের অধিকাংশ জনগণ প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের ওপর রীতিমতো ক্ষুব্ধ। ইমরান এটাকেই তার শক্তি হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থণের ওপর ভর করে, হাইকোর্টে পিটিশনের মাধ্যমে নওয়াজকে রাজনীতি থেকে আপাতত নির্বাসনে পাঠাতে সফলও হয়েছেন তিনি।

পারমানবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ পাকিস্তানে বর্তমানে অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাণিজ্য ঘাটতি ৩৬ বিলিয়নের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, দেশটির ২৯.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে এবং শিক্ষার হার মাত্র ৫৮ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র ১৬ বছর ধরে আফগানিস্তান যুদ্ধের সাপ্লাই রুট হিসেবে পাকিস্তানকেই ব্যবহার করে আসছে। পাক সামরিক বাহিনীও যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেয়। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে তালেবানের মতো সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকেও লালনপালন করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ২০১৮ সালের প্রথম টুইটবার্তায় বলেছিলেন, পাকিস্তানকে দেওয়া ৩৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা আর বেঈমানি ছাড়া আর কিছুই পায়নি। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা সহায়তা বাবদ দেশটিকে দেওয়া ২ বিলিয়ন ডলারের অনুদান বাতিল করেছেন। পাকিস্তান বিনামূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে সেগুলোও প্রত্যাহার করতে চান বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প।

তবে পাকিস্তানের তেহরিক ই ইনসাফ পার্টির নেতা ইমরান খান বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছে। বিনিময়ে যা পেয়েছে তা হলো, ৭০ হাজার পাকিস্তানির মৃত্যু, ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং দুর্বল হয়ে পড়া জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।”  যুক্তরাষ্ট্রের দাসত্ব বরণ করার বিরুদ্ধে হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে তিনি বিক্ষোভও করেছেন তিনি।

ট্রাম্প সম্পর্কে ইমরানের মন্তব্য হলো, তিনি একজন উম্মাদ এবং ইসলাম সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে এবং বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তিনি বিশ্বজুড়ে ইসলামভীতি জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে থাকলেও ইমরান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বলে মনে করেন না। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তে প্রতিবেশী পরাশক্তি ও ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার চীনের দিকেই তাঁর দৃষ্টি থাকবে। পাকিস্তান চীনা অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতারাষ্ট্র। বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ককে ইমরান একটি আকর্ষণীয় সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।

নির্বাচনে ইমরানের জয়লাভ করার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবুও তিনি ২০১৩ সালের নির্বাচনের চেয়ে বেশি সমর্থন পাচ্ছেন, সেবার তার দল পিটিআই তৃতীয় সর্বাধিক ভোট পেয়েছিল।

উইড্রো উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, এবারের নির্বাচনে পিটিআই যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে। এর কারণ ইতিমধ্যেই ইমরান একজন দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

ইমরান অবশ্য কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিংবা কোনো জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর মতে, মিডিয়া ও জরিপে জনমতের ভুল চিত্রও প্রকাশ পেতে পারে, যেটা ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে হয়েছিল। তবে তাঁর রক্ষণশীল নীতি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করার কারণে অনেকেই তাকে ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করছেন।

অনেকেই যে প্রশ্নটি করছেন সেটা হলো, ইমরান কি তবে ‘পাকিস্তানি ট্রাম্প’ হতে যাচ্ছেন? বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে এই কিংবদন্তি হেসে বলেন, আমি ট্রাম্পের ঠিক উল্টোটা। আমাকে বরং বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে তুলনা করা যায়।’

উপরে